মধুপুরে গারো উচ্ছেদ: ইতিহাস, প্রকৃতি ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
গারো সমাজের উৎসব
টাঙ্গাইলের মধুপুরে একটি গারো পরিবারের ঘর গুঁড়িয়ে উচ্ছেদের ঘটনা কেবল একটি স্থানীয় প্রশাসনিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, ইতিহাস এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সহাবস্থানের প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। জমি উদ্ধারের নামে একটি পরিবারকে নোটিশ ছাড়াই উচ্ছেদ করা, তাদের বাড়িঘর ও আশপাশের গাছপালা ধ্বংস করা—এসব শুধু মানবিকতার পরিপন্থী নয়, বরং একটি প্রাচীন সংস্কৃতি ও জীবনধারার প্রতি অবজ্ঞার প্রকাশ।
গারো জনগোষ্ঠী, যারা নিজেদের আচিক নামে পরিচয় দেন, বাংলাদেশের মধুপুর গড়, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বনাঞ্চলে বহু শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছেন। তাদের ইতিহাস কেবল একটি জাতিগত পরিচয়ের ইতিহাস নয়; এটি বন, পাহাড়, নদী ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের ইতিহাস।
গারো সমাজের নিজস্ব ভাষা, সামাজিক কাঠামো ও উৎসব রয়েছে। তাদের সমাজ মাতৃতান্ত্রিক—পরিবারের সম্পত্তি ও বংশধারা সাধারণত নারীদের মাধ্যমে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রবাহিত হয়। ওয়াঙ্গালা উৎসব, যা নতুন ফসল কাটার আনন্দে উদযাপিত হয়, গারো সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। ঢোলের তালে নৃত্য, গান এবং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ—এই উৎসবের মূল বৈশিষ্ট্য।
গারোদের জীবনধারা মূলত প্রকৃতিনির্ভর। বন তাদের কাছে কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি তাদের অস্তিত্বের অংশ। তারা জুম চাষ, ছোট আকারের কৃষিকাজ, ফলমূল ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করে। এই জীবনধারা পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলে—যেখানে অতিরিক্ত শোষণের বদলে টেকসই ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মধুপুরের গজারি বন একসময় সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের আধার ছিল। এই বনের সঙ্গে গারোদের সম্পর্ক ছিল সহমর্মিতা ও যত্নের। কিন্তু গত কয়েক দশকে বনভূমি দখল, রাবার বাগান স্থাপন এবং বাণিজ্যিক কৃষির বিস্তারের ফলে সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে। এতে শুধু পরিবেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেই জনগোষ্ঠীও, যারা দীর্ঘদিন ধরে এই বনের অভিভাবকের মতো বসবাস করেছে।
মধুপুরে সাম্প্রতিক উচ্ছেদের ঘটনা এই দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। যদি সত্যিই কোনো জমি নিয়ে আইনি জটিলতা থাকে, তবে তার সমাধান অবশ্যই আইনসম্মত ও মানবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত। কিন্তু কোনো লিখিত নোটিশ ছাড়াই একটি পরিবারের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল বন সংরক্ষণ নয়; সেই বনের সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষের অধিকার রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জমি ও বসবাসের অধিকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালাতেও স্বীকৃত।
বাংলাদেশের মতো একটি বহুসাংস্কৃতিক দেশে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রশ্নে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। গারোদের মতো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং জীবনধারাকে অস্বীকার করে কোনো উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
বরং প্রয়োজন এমন একটি নীতি, যেখানে বন সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হবে। গারোদের বন থেকে বিচ্ছিন্ন করা মানে শুধু একটি জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করা নয়; এর অর্থ একটি প্রাচীন জ্ঞানব্যবস্থা ও পরিবেশবান্ধব জীবনধারাকে হারিয়ে ফেলা।
আমি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, আবেগ ও অনুভূতি নিয়ে কাজ করে আসছি। পাহাড়ের মারমা ভাষায় প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম, তাদের নীরব বেদনা এবং অদম্য টিকে থাকার লড়াই। বাংলাদেশে নৃগোষ্ঠীর ভাষায় প্রথম সেন্সর সার্টিফিকেশন পাওয়া চলচ্চিত্র গিরিকন্যা যা ২০২২ সালে নির্মাণ করেছিলাম।
একইভাবে ম্রো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় নির্মাণ করেছি, ‘ক্লোবং ম্লা’ বা ‘গিরিকুসুম’। এছাড়াও বম ও খিয়াং ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা আমাকে এই মানুষগুলোর জীবনকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে।
এই জনগোষ্ঠীগুলোর প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভাষা আছে, রয়েছে বৈচিত্র্যময় আচার-সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও জীবনদর্শন। তাদের সংস্কৃতি প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত—পাহাড়, বন ও নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে তাদের জীবন।
যখন রাষ্ট্র এই মানুষগুলোর ওপর হামলে পড়ে, তখন আমরা গভীরভাবে বিচলিত হই। কারণ তাদের আদি জনপদ থেকে উচ্ছেদের প্রক্রিয়া কেবল একটি বসতভিটা হারানোর ঘটনা নয়; এটি তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অস্তিত্বের ওপর আঘাত হানে।
একজন নির্মাতা হিসেবে আমি বারবার দেখেছি—এই প্রান্তিক মানুষের গল্পগুলো আসলে আমাদের দেশেরই গল্প। তাদের সংগ্রাম, তাদের স্বপ্ন এবং তাদের বেঁচে থাকার লড়াই আমাদের সমাজের বিবেককে প্রশ্ন করে। তাই মধুপুরে গারোদের উচ্ছেদের মতো ঘটনা শুধু একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি আমাদের সামষ্টিক ন্যায়বোধ ও মানবিকতারও পরীক্ষা।
মধুপুরের ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতি, ইতিহাস ও মানুষের সম্পর্ককে উপেক্ষা করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত সমাজে অস্থিরতা তৈরি করে। গারোদের মতো জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বেঁচে থাকার এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। তাদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষারও অপরিহার্য শর্ত।
এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ এখন সময়ের দাবি। কারণ একটি সমাজের সভ্যতার মানদণ্ড নির্ধারিত হয়—সে সমাজ তার দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কতটা সম্মান দেয়, তার আচরণের ওপর।
লেখক: প্রদীপ ঘোষ, চলচ্চিত্র নির্মাতা

