অপারেশন এপিক ফিউরি: কূটনীতির মৃত্যু ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের নতুন সূচনা
নিজস্ব প্রতিবেদক |
শনিবার ভোরে তেহরান, ইসফাহান, কোম, কারাজ, তাবরিজ এবং কেরমানশাহ—ইরানের এই ছয়টি প্রধান শহর যখন শক্তিশালী বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে, তখন বিশ্ব প্রত্যক্ষ করল সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক উত্তেজনা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই আক্রমণকে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে অভিহিত করেছেন, যা কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতির কফিনে শেষ পেরেক হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
কূটনীতি যখন যুদ্ধের অস্ত্র
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জেনেভায় ইরান ও মার্কিন প্রতিনিধিদের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছিল। ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে নীতিগতভাবে রাজি হয়েছিল। কিন্তু ওয়াশিংটন এই নমনীয়তাকে কূটনীতির সুযোগ হিসেবে না দেখে বরং আক্রমণের ‘সুযোগ’ (Window of Opportunity) হিসেবে গ্রহণ করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জেনেভা আলোচনা ছিল মূলত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের একটি কৌশল বা ‘ক্যামোফ্লেজ’। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর মতে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এমন কোনো পর্যায়ে ছিল না যা এই ধরনের একতরফা হামলার যৌক্তিকতা দেয়।
দমন বনাম প্রতিরোধের সমীকরণ
গত চার দশক ধরে ইরান নিষেধাজ্ঞা ও অন্তর্ঘাতমূলক হামলার শিকার হলেও তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেনি। ২০২৫ সালের জুনে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর ইরান অত্যন্ত সীমিত পাল্টা জবাব দিয়েছিল, যাকে ওয়াশিংটন ‘দুর্বলতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। বর্তমানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যু এবং কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার পর ইরান অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দেশটির হাতে এখন পারমাণবিক সক্ষমতা না থাকলেও রয়েছে বিপুল পরিমাণ স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘হরমুজ প্রণালী’র মতো কৌশলগত জলপথ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল এই পথ দিয়ে সরবরাহ হয়, যা এখন চরম হুমকির মুখে।
আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কোনো প্রস্তাব বা সরাসরি আত্মরক্ষার (ধারা ৫১) কোনো যুক্তি ছাড়াই এই হামলা চালানো হয়েছে। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় যেমন সাজানো নথির প্রয়োজন হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তারও প্রয়োজন নেই; কেবল একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টই এখন যুদ্ধের ঘোষণাপত্র। নেতানিয়াহু একে ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’ বললেও, এটি মূলত ‘প্রিভেন্টিভ ওয়ার’ বা নিবারক যুদ্ধের এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে যে, ইরান থেকে ইতিমধ্যে ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। তেলের দাম গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ট্রাম্পের ‘মুক্তির বার্তা’ ইরাক যুদ্ধের পূর্ববর্তী ভাষণের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, যা আসলে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা ক্ষমতা পরিবর্তনের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা।
৯ কোটি মানুষের দেশ ইরান কেবল একটি রাষ্ট্র নয়, বরং একটি জাতীয়তাবাদী শক্তির আধার। ভিয়েতনাম বা লিবিয়ার ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বোমাবর্ষণ করে কোনো জাতিকে নতজানু করা যায় না। আজকের এই হামলা কেবল বোমার ধ্বংসলীলা নয়, বরং একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করল—যেখানে কূটনীতিকে প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের এই অবক্ষয় আগামী কয়েক দশক ধরে বিশ্বকে এক অস্থির ও পরমাণু অস্ত্রের প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দেবে।

