এশিয়ান কাপে হারলেও চীনের ঘাম ছুটিয়ে দিল লড়াকু বাংলাদেশ
স্পোর্টস ডেস্ক
৪৬ বছর পর মহাদেশীয় ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে ফিরল বাংলাদেশ। নারী এশিয়ান কাপে নিজেদের অভিষেক ম্যাচে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ও ৯ বারের শিরোপাজয়ী চীনের মুখোমুখি হয়েছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। অভিজ্ঞতায় চীন যোজন যোজন এগিয়ে থাকলেও মাঠের লড়াইয়ে তাদের রীতিমতো ঘাম ছুটিয়ে দিয়েছে পিটার বাটলারের শিষ্যরা। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) ম্যাচে ২-০ গোলে হারলেও টাইগ্রেসদের সাহসী পারফরম্যান্স ফুটবলবিশ্বের প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই ফেবারিট চীন একের পর এক আক্রমণ শানাতে থাকে। তবে বাংলাদেশের ডিফেন্ডারদের দৃঢ়তা ও গোলরক্ষক মিলি আক্তারের অসাধারণ সব সেভ প্রথমার্ধের ৪৪ মিনিট পর্যন্ত চীনকে আটকে রাখতে সক্ষম হয়। ম্যাচের ১২ মিনিটেই গোল হজম করতে পারত বাংলাদেশ, তবে মিলির বীরত্বে রক্ষা পায় দল। দুই মিনিট পরেই বাংলাদেশ পাল্টা আক্রমণ চালায়। ১৪ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে ঋতুপর্ণা চাকমার এক দূরপাল্লার শট চীনের গোলরক্ষক চেন চেন কোনোমতে আঙুল ছুঁইয়ে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন।
চীনের একটি গোল ভিএআর (VAR)-এর কল্যাণে অফসাইড বলে বাতিল হলে গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের মনে আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে মনোযোগের সামান্য বিচ্যুতিতে সর্বনাশ হয়ে যায়। ৪৪ মিনিটে চীনের মিডফিল্ডার ওয়াং সুয়াং দূরপাল্লার এক অবিশ্বাস্য শটে ডেডলক ভাঙেন। এর রেশ কাটতে না কাটতেই যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে (৪৬ মিনিট) ঝ্যাং রুইয়ের একটি নিচু শট বাংলাদেশের ডিফেন্ডার কোহাতি কিসকুর পায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়ায়। মাত্র তিন মিনিটের ঝড়ে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ বিরতিতে যায়।
বিরতি থেকে ফিরে ব্যবধান বাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ আরও সুসংগঠিত ফুটবল খেলে। চীনের একের পর এক আক্রমণ বাংলাদেশের রক্ষণভাগে এসে মুখ থুবড়ে পড়ে। পুরো ম্যাচে চীন ২৪টি শট নিলেও বাংলাদেশ দ্বিতীয়ার্ধে আর কোনো গোল হজম করেনি। ৮০ মিনিটে চীনের সরাসরি কর্নার কিক ক্রসবারে লেগে ফিরে এলে বড় ব্যবধানে হার থেকে বেঁচে যায় টাইগ্রেসরা। ৮৬ মিনিটে অভিষেক ঘটে সুইডেনপ্রবাসী আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীর, তবে সময়ের স্বল্পতায় তিনি বিশেষ কিছু করার সুযোগ পাননি।
ম্যাচ শেষে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় ছিল গোলরক্ষক মিলি আক্তার। অভিজ্ঞ রূপনা চাকমার বদলে মিলিকে একাদশে নামিয়ে বাজি ধরেছিলেন কোচ পিটার বাটলার। ম্যাচের ১২, ১৮, ২০ ও ৬৮ মিনিটে মিলির চারটি দুর্দান্ত সেভ বাংলাদেশকে বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে। খোদ চীনের কোচ আন্তে মিলিচিচও মিলির পারফরম্যান্সে বিস্ময় প্রকাশ করে তাকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। মিলি জানিয়েছেন, স্নায়ুচাপ থাকলেও আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি বড় দলের বিপক্ষে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে চেয়েছেন।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কোচ পিটার বাটলার বলেন, “মেয়েরা দেশের নাম উজ্জ্বল করেছে এবং জার্সির মান রেখেছে। আমরা শুধু রক্ষণ সামলাতে এখানে আসিনি, আমরা আমাদের সামর্থ্য দেখাতে এসেছি এবং সেটি পেরেছি। আমি আমার ১৯-২০ বছরের তরুণ দল নিয়ে গর্বিত।” চীনের কোচও স্বীকার করেছেন যে মারিয়া মান্দা, মনিকা চাকমা এবং ঋতুপর্ণা চাকমারা টেকনিক্যালি অত্যন্ত দক্ষ এবং তারা ভবিষ্যতে এশিয়ান ফুটবলে বড় শক্তি হয়ে উঠবে।
হার দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু হলেও দাপুটে চীনের বিপক্ষে এই লড়াই বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য বড় এক অনুপ্রেরণা। বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের বিপক্ষে ৪০ শতাংশ বল দখল এবং লড়াকু মানসিকতা জানান দিচ্ছে, সঠিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ পেলে বাংলাদেশের নারীরা বিশ্বমঞ্চে রাজত্ব করার সামর্থ্য রাখে।

