৯৭৩ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অডিট: ৯০ কোটি টাকা ফেরতের সুপারিশ
নিজস্ব প্রতিবেদক |
দেশের শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত এক বিশাল অভিযানে ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) দেশের ৯৭৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অডিট চালিয়ে প্রায় ৯০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের তথ্য পেয়েছে। রোববার (১ মার্চ) সংস্থাটির ওয়েবসাইটে এই সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর তদন্ত প্রতিবেদন ও তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসব্যাপী এই ব্যাপক পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীনে থাকা মোট ৯৭৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই তদন্তের আওতায় ছিল। ডিআইএ-এর নোটিশ বোর্ডে প্রকাশিত এই তালিকায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের সুনির্দিষ্ট বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনিয়মের ধরণগুলো অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং গভীর। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো জাল ও ভুয়া সনদ ব্যবহার করে শিক্ষকতা ও অন্যান্য পদে চাকরি। তদন্তে উঠে এসেছে যে, অনেক শিক্ষক ও কর্মচারী অগ্রহণযোগ্য সনদ দিয়ে নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা (এমপিও) উত্তোলন করে আসছিলেন। এছাড়া ভুয়া নিয়োগ প্রক্রিয়া, সরাসরি অর্থ আত্মসাৎ এবং ভ্যাট ও আয়কর (আইটি) সংক্রান্ত গুরুতর আর্থিক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া মোট ৮৯ কোটি ৮২ লাখ ২৫ হাজার ৬০৭ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার জন্য জোর সুপারিশ করেছে ডিআইএ। শুধু আর্থিক অনিয়মই নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেদখল হয়ে যাওয়া প্রায় ১৭৬ দশমিক ৫২৩ একর জমি উদ্ধারের বিষয়েও প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অনিয়ম ও দুর্নীতির এই খতিয়ান ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোতে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। এছাড়া প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারদের কাছেও ই-মেইলের মাধ্যমে প্রতিবেদনগুলো পাঠানো হয়েছে।
ডিআইএ জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট জেলা শিক্ষা অফিস, শিক্ষা বোর্ড এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতিদের কাছেও ই-মেইলের মাধ্যমে এই প্রতিবেদন পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘ডি-নথি’ সিস্টেম ব্যবহার করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে এই তথ্য আদান-প্রদান করা হচ্ছে।
ডিআইএ-এর পরিচালক জানিয়েছেন, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কারিগরি ত্রুটির কারণে নির্ধারিত ই-মেইলে প্রতিবেদন না পেয়ে থাকে, তবে তারা সংশ্লিষ্ট জেলা শিক্ষা অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডি-নথি সিস্টেম থেকে তা সংগ্রহ করতে পারবে। এরপরও কোনো সমস্যা হলে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব লেটারহেড প্যাডে আবেদন করে ডিআইএ-এর ই-মেইলে (director@dia.gov.bd) পাঠাতে হবে। আবেদন পাওয়ার তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদনটি পুনরায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধার এবং জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এখন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই তদন্ত প্রতিবেদন বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দুর্নীতি অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

