ইরান-মার্কিন সংঘাত: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অশনি সংকেত ও চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক |

শনিবার ভোরে ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অতর্কিত হামলা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ বিশ্বরাজনীতিতে যে কম্পন সৃষ্টি করেছে, তার সরাসরি আঁচ লাগতে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও জ্বালানি তেল, রেমিট্যান্স এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে এই যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে।

জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতি

মধ্যপ্রাচ্য হলো বিশ্বের জ্বালানি তেলের প্রধান উৎস। সংঘাত শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ তার জ্বালানি তেলের সিংহভাগই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। এই যুদ্ধের ফলে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে পরিবহন খরচ বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের দামের ওপর। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দেবে।

রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কা

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও সৌদি আরবে কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত আছেন। ইরান ইতোমধ্যে এসব দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা শুরু করায় সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ওমরাহ পালন শেষে ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিমের মতো হাজারো যাত্রী ইতিমধ্যে বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন। যুদ্ধের বিস্তৃতি ঘটলে প্রবাসীদের আয় কমে যাবে এবং অনেকেই দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হতে পারেন। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের টান পড়বে।

রপ্তানি বাণিজ্য ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের বড় বাজার হলো ইউরোপ ও আমেরিকা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে আকাশপথ ও নৌপথ অনিরাপদ হয়ে উঠছে। ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ বা হরমোজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হবে। এর ফলে জাহাজ ভাড়া বা ফ্রেইট চার্জ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়লে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে, যা বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমিয়ে দেবে।

এলডিসি উত্তরণ ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এমন সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বাংলাদেশের এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সরকারের উন্নয়ন বাজেট ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে, যা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ কমিয়ে দিতে পারে।



ইরান-মার্কিন এই যুদ্ধ কেবল সামরিক শক্তির লড়াই নয়, এটি বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, সংকট মোকাবিলায় সরকারকে এখনই বিকল্প জ্বালানি উৎস সন্ধান, রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে একটি আপদকালীন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায়, বিশ্ব রাজনীতির এই দহন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।

Previous
Previous

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত, ইরানে ৪০ দিনের শোক

Next
Next

ইরানে হামলার ঘটনায় দ্বিধাবিভক্ত বিশ্বনেতারা: চরম উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্য