মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিকুণ্ড ও চীনের দোটানা: অর্থনৈতিক ঝুঁকি বনাম কৌশলগত সমীকরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক বিধ্বংসী হামলা এবং ইরানের পাল্টা হুঙ্কার বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। এই অস্থিরতার সরাসরি ধাক্কা এখনো বেইজিংয়ের গায়ে না লাগলেও, এর ঢেউ অনুভূত হতে শুরু করেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের নীতিনির্ধারণী মহলে। একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে চীন এখন এক কঠিন হিসাব-নিকাশের মুখে।


জ্বালানি নিরাপত্তা ও স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি

আপাতদৃষ্টিতে চীনের কাছে আগামী কয়েক মাসের জন্য পর্যাপ্ত তেলের মজুত রয়েছে। এছাড়া রাশিয়ার মতো ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর কাছ থেকে জরুরি প্রয়োজনে জ্বালানি সহায়তা নেওয়ার সুযোগও বেইজিংয়ের হাতে আছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, চীন প্রতিদিন প্রায় ১৩.৮ লক্ষ ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, যা তাদের মোট আমদানির ১২ শতাংশ। হরমুজ প্রণালি আংশিক অবরুদ্ধ হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়া চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।


অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ ও বেইজিং বৈঠক

এই সংকট এমন এক সময়ে এসেছে যখন বেইজিংয়ে কমিউনিস্ট পার্টির হাজারো প্রতিনিধি বার্ষিক বৈঠকে বসেছেন। চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এখন আবাসন খাতের সংকট, বিপুল স্থানীয় ঋণ এবং ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় সংকোচনের চাপে জর্জরিত। ১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমাতে বাধ্য হয়েছে শি জিনপিং সরকার। এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হলে চীনের রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতি নতুন করে ধাক্কা খাবে।


ইরান-চীন সম্পর্ক: বন্ধু না কি লেনদেন?

পশ্চিমা বিশ্লেষকরা ইরানকে চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র মনে করলেও বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। কিংস কলেজের অধ্যাপক কেরি ব্রাউনের মতে, এই সম্পর্ক মূলত 'লেনদেনভিত্তিক'। ২০২১ সালে ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তিতে চীন ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেও তার খুব সামান্য অংশই ইরানে পৌঁছেছে। চীন ইরানকে মূলত ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি 'স্থায়ী বিরক্তি' হিসেবে। আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক গভীরতা না থাকায় এই সম্পর্ক বেশ ভঙ্গুর। বিশেষ করে, মিত্র দেশগুলোর বিপদে সামরিকভাবে এগিয়ে আসার সক্ষমতা বা ইচ্ছা—কোনোটিই বেইজিং এখনো দেখায়নি।


পরাশক্তি হিসেবে সীমাবদ্ধতা

ভেনিজুয়েলা এবং বর্তমানে ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক পদক্ষেপ চীনের একটি সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। বেইজিং নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে দাবি করলেও, সামরিকভাবে তারা এখনো ‘দর্শক’ পর্যায়েই রয়ে গেছে। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের ফিলিপ শেটলার-জোনস বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র দেখিয়ে দিচ্ছে প্রকৃত পরাশক্তি হওয়ার অর্থ কী—বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে গিয়ে পরিস্থিতি প্রভাবিত করার ক্ষমতা।" চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হলেও মিত্রদের রক্ষা করার মতো সামরিক সক্ষমতা এখনো অর্জন করতে পারেনি।


ট্রাম্পের সফর ও ভবিষ্যৎ কৌশল

এই উত্তেজনার মধ্যেই চলতি মাসের শেষের দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের কথা রয়েছে। চীন সরাসরি ট্রাম্পের সমালোচনা না করে অত্যন্ত সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বেইজিং আশা করছে, এই সফরের মাধ্যমে তাইওয়ানসহ অন্যান্য স্পর্শকাতর ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান বোঝা যাবে। যদি এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে অজনপ্রিয় হয়, তবে ওয়াশিংটন ভবিষ্যতে অন্য দেশে সামরিক হস্তক্ষেপে সংযত হতে পারে—যা কৌশলগতভাবে চীনের জন্য সুবিধাজনক।


মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, চীনের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ তত বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে। বিশেষ করে আফ্রিকা ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে চীনের যে বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে, তা অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। শি জিনপিং এখন নিজেকে একজন 'স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য' নেতা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, যিনি সংঘাত নয় বরং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চান। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুনের আঁচ থেকে চীন শেষ পর্যন্ত নিজেকে কতটা আড়ালে রাখতে পারবে, তা নির্ভর করছে রণক্ষেত্রের আগামী দিনগুলোর ওপর।

Previous
Previous

ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ কোটি ডলারের রাডার ধ্বংস

Next
Next

হরমুজ প্রণালিতে শুধুমাত্র ইসরায়েল ও পশ্চিমা জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞাঃ ইরান