২০ বছর পর বড় ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি

দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বড় রাজনৈতিক ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠনের পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জয় দলটিকে এককভাবে সরকার গঠনের পাশাপাশি সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাংবিধানিক সক্ষমতাও দিয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি ফল অনুযায়ী, ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয় পেয়েছে বিএনপি। ৩০০ আসনের সংসদে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৫১টি আসন, অর্থাৎ অর্ধেকের সামান্য বেশি। সে হিসাবে প্রায় ৬৯ শতাংশ আসনে জয় নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি।

এই বিজয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ও স্বস্তি বিরাজ করছে। এখন সবার দৃষ্টি সরকার গঠন ও শপথ গ্রহণের দিকে। আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ বিজয়ের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অঙ্গীকার, দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য, দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে নেতাকর্মীদের অবস্থান, প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও জিয়া পরিবারের ত্যাগ—সব মিলিয়ে একটি আবেগঘন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়। তবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন এবং সক্রিয় নেতৃত্ব। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর তার সক্রিয় অংশগ্রহণ নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।

নির্বাচনী প্রচারে তার কৌশলী নেতৃত্ব, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ দলকে পুনরুজ্জীবিত করেছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত। তাদের মতে, তিনি কেবল নির্বাচনী জয়ই নিশ্চিত করেননি, বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরেছেন।

তার নেতৃত্বে তরুণ প্রজন্ম ও নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা জোরদার হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে পরিবারভিত্তিক সহায়তা কার্ড, কৃষকদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও ঋণ মওকুফের মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মন্তব্য করেন, তারেক রহমানের পরিকল্পিত ও বুদ্ধিনির্ভর নেতৃত্ব, প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সময়োপযোগী প্রচারণা কৌশলই এ সাফল্যের বড় কারণ।

দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর এই বিজয় উদার গণতন্ত্রের পক্ষে জনগণের রায়। তিনি এটিকে সংগ্রামের ফসল হিসেবে উল্লেখ করেন এবং গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের সূচনা হিসেবে দেখেন।

নির্বাচনে বড় ম্যান্ডেট পাওয়ায় জনগণের প্রত্যাশাও বেড়েছে। স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, অর্থনীতি ও প্রশাসনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন—এসবই এখন নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও নতুন সরকারের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ভারত, চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা ও সমন্বয় বজায় রাখা একটি বড় কৌশলগত বিষয় বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবিরও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছেন।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে নতুন সরকার।

উল্লেখ্য, বিএনপি সর্বশেষ ২০০১ সালে সরকার গঠন করেছিল। সেই সময় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও জোট সরকার গঠন করা হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পর এবার নতুন নেতৃত্বে দলটি পুনরায় বিপুল সমর্থন অর্জন করেছে। প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শূন্য হওয়া চেয়ারম্যান পদে তারেক রহমান দায়িত্ব নেন এবং প্রথমবারের মতো দলকে নির্বাচনে নেতৃত্ব দিয়ে বড় জয় এনে দেন।

Previous
Previous

শপথ নিয়েছেন বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা

Next
Next

তারেক রহমান সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত